মাদক নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়ে পুরোপুরি কি মাদকের অভিশাপ থেকে নিজেকে রক্ষা করা সম্ভব?

 

মাদকদ্রব্য
যে সব দ্রব্য সেবনে মানুষের শারীরিক ও মানসিক অবসন্নতা আনয়ন করে বা কোনো ক্ষেত্রে স্নায়ুর উত্তেজনা সৃষ্টি করে বা ব্যথা উপশম করে তাই হলো মাদকদ্রব্য। যখন কোনো ব্যক্তি এসব দ্রব্য সেবন ছাড়া চলতে পারে না অর্থাৎ এর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে তখন ঐ ব্যক্তিকে আমরা মাদকাসক্ত বলে থাকি। কোনো কিছুর প্রতি প্রবল আকর্ষণকে আসক্তি বলে। এ আকর্ষণ অভ্যাসজনিত। আসক্তি বিষয়টি আজকের নয়। মানব সৃষ্টির শুরু থেকেই এ আশক্তির শুরু। এ আশক্তির জন্য পৃথিবীর আদি মানব স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হয়েছে। আজ সমাজ সংসার থেকে মানুষ অকালে।

 

 

মানুষের মাদকাসক্ত হওয়ার বহুবিধ কারণ

(১) মাদক দ্রব্যের প্রতি কৌতূহল, (২) বেকারত্ব আর্থিক অনটন ও জীবনের প্রতি হতাশা, (৩) বন্ধু-বান্ধব সঙ্গীদের প্রভাব, (৪) নতুন অভিজ্ঞতা লাভের আশা, (৫) নৈতিক শিার অভাব, (৬) মাদক দ্রব্যের সহজ লভ্যতা, (৭) পারিবারিক কলহ ও অশান্তি, (৮) পরিবারে মাদক দ্রব্যের ব্যবহার, (৯) পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রভাব, (১০) মাদক দ্রব্যের কুফল সম্পর্কে অজ্ঞতা, (১১) কৈশর ও যৌবনে বেপরোয়া মনোভাব, (১২) সহজ আনন্দ লাভের বাসনা, (১৩) সর্বপরি ধর্মীয় জ্ঞান ও অনুশাসনের অভাব।

 

 

কুফল

মাদকাসক্তি একটি মারাত্মক মরণ ব্যাধি। মাদক দ্রব্য সেবনের ফলে মানুষের বহুবিধ ক্ষতি হয়ে থাকেঃ
(১) মানসিক উত্তেজনা, চরম অবসাদ, উচ্ছৃঙ্খল আচরণ, অসংলগ্ন ব্যবহার, আত্মহত্যার প্রবণতা ইত্যাদি দেখা যায়।
(২) শারীরিক রোগ, রক্ত দূষণ, কর্ম দতা হ্রাস, শরীরে খিচুনী হয়, বমি বমি হয়, বুদ্ধি লোপ পায়, অনিদ্রা, পেটে ব্যথা, ক্ষুধা মন্দা, স্নায়ুবিক দুর্বলতা ইত্যাদি দেখা যায়।
(৩) সামাজিক ভাবে জীবনের প্রতি হতাশা, কাজে অনীহা, পারিবারিক অশান্তি ওঃ অপরাধ প্রবণতা, সমাজে ঘৃণ্য ব্যক্তি হিসেবে গণ্য হয়।
(৪) আর্থিকভাবে সর্বশান্ত পরিবার পরিজনকে অনটনে ফেলা, চুরি-ডাকাতি, রাহাজানি প্রবণতা বৃদ্ধি, বন্ধু-বান্ধবদের কাছে হাত পাতা, শেষ বয়সে অতি কষ্টে নিঃসঙ্গ জীবনযাপন।

 

করনীয়

মাদক দ্রব্যের ছোবলে গোটা দেশ আজ আক্রান্ত। এর ভয়াবহ পরিণতি দেখে প্রশাসন বিচলিত, অভিভাবকরা আতঙ্কিত, চিকিৎসকরা দিশেহারা। মাদক আসক্তদের জন্য খোলা হয়েছে “এ্যান্টি ড্রাগ সেল” দেশের হেরোইন চোরাচালানীদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠোর আইন রয়েছে। তারপরও মাদক আসক্তির পরিমাণ উত্তোরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ জন্য পাড়ায় পাড়ায় গড়ে তুলতে হবে প্রতিরোধ ব্যবস্থা। তাছাড়াও মাদকাসক্তির কবল থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে যেমন-(১) নৈতিকতার কার্যক্রম প্রসার করা, (২) চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, (৩) বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা, (৪) সামাজিক আন্দোলন হিসাবে গ্রহণ করা, (৫) মাদকদ্রব্যের সহজ লভ্যতা রোধ করা, (৬) মাদক বিরোধী আইন প্রতিষ্ঠা করা, (৭) মাদকদ্রব্যের কুফল সবার কাছে তুলে ধরা, (৮) পারিবারিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা, (৯) বব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে গণসচেতন করে গড়ে তোলা, (১০) খারাপ সঙ্গ পরিত্যাগ করা, (১১) সেবনকারীদের প্রশিণের মাধ্যমে ব্যক্তিগত ও সামাজিক দতা বৃদ্ধি করা, (১২) মাদক দ্রব্য ক্রয়-বিক্রয় রোধ করা, (১৩) পাঠ্যসূচিতে মাদক সেবনের ভয়াবহতা তুলে ধরা, (১৪) মাদক দ্রব্য প্রতিরোধ দিবস জাতীয় ভাবে পালন করা।

 


নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসা

সারাদেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা প্রায় ৫০ লাখ। কিন্তু এদের চিকিৎসার জন্য সরকারি নিরাময় কেন্দ্র আছে মাত্র চারটি। এগুলোতে মোট শয্যা সংখ্যা ৫৫টি। এর মধ্যে চিকিৎসক সংকটে পাঁচ শয্যাবিশিষ্ট খুলনার ময়লাপোতার নিরাময় কেন্দ্র প্রায় তিন বছর ধরে বন্ধ। ঢাকার তেজগাঁওয়ে ৪০ শয্যার কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসক আছেন সাতজন। রাজশাহীর উপশহর ও চট্টগ্রামের পাঁচলাইশের নিরাময় কেন্দ্রে শয্যা আছে পাঁচটি করে, চিকিৎসক আছেন একজন করে। নেই আধুনিক কোনো যন্ত্রপাতি। এসব থেকেই বোঝা যায়, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর পরিচালিত সরকারি কেন্দ্রগুলোর মাদকাসক্ত চিকিৎসার করুণ অবস্থা। অন্যদিকে ঢাকাসহ সারা দেশে বেসরকারিভাবে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে তিন শতাধিক। এগুলোর মধ্যে ঢাকার ছয়টিসহ মোট ৫৪টির মতো কেন্দ্রের অনুমোদন (লাইসেন্স) রয়েছে। বেসরকারি মাদকাসক্ত নিরাময় ও মাদকাসক্ত পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং পরিচালনার জন্য আবাসিক এলাকার পাকা বাড়ি বা ভবনে অবস্থিত, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, নিরিবিলি সুন্দর পরিবেশ হতে হবে। একজন রোগীর জন্য কমপক্ষে ৮০ বর্গফুট জায়গা, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা থাকতে হবে। অন্যদিকে প্রতি ১০ বেডের জন্য পৃথক একটি টয়লেট, বাথরুম, বিশুদ্ধ পানি অন্যান্য সুব্যবস্থা এবং খণ্ডকালীন বা সার্বক্ষণিক একজন মনঃচিকিৎসক, সার্বক্ষণিক একজন ডাক্তার, দু'জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স বা বয়, একজন সুইপার বা আয়া এবং জীবনরক্ষাকারী উপকরণ ও অত্যাবশ্যক ওষুধপত্রাদি থাকতে হবে। এ ছাড়া মাদকাসক্ত ব্যক্তির রক্ত, কফ, মলমূত্র ইত্যাদি পরীক্ষার জন্য অনুমোদিত যে কোনো ডায়াগনস্টিক সেন্টার সঙ্গে সম্পৃক্ত ও চিকিৎসা সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য সংরক্ষণের সুবিধা থাকতে হবে। কেন্দ্রে একক বা দলগত পরামর্শক এবং মানসিক বিনোদনের জন্য অভ্যন্তরীণ খেলাধুলা, পত্রিকা, ম্যাগাজিন, টেলিভিশন ও কাউন্সেলিংয়ের জন্য ২০ জনের উপযোগী একটি শ্রেণীকক্ষ থাকা অন্যতম। কিন্তু বেশিভাগ নিরাময় কেন্দ্র মানছে এ নিয়ম।

 

 

অবশ্যই মাদকাশক্তির নিরাময় আছে। যথাযথ পদক্ষেপ নিয়ে চিকিৎসা চালালে অবশ্যই রোগী সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাবে।

 

 

0 Reviews

Add Your Reviews

Rating